শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ০৩:১৩ পূর্বাহ্ন


Bd-Times

অন্যান্য পর্যটন

  Print  

ভূ-স্বর্গ কাশ্মীর, ঐতিহ্যের দিল্লী এবং দাদাবাবুদের কলকাতার পথে পথে (পর্ব:৬)

   


রেজাউল হক রিয়াজ | প্রকাশিত: ১১:৫৪ পিএম, বুধবার, ২৮ - মার্চ - ২০১৮



পর্ব:৬


বিকাল ৪ টা নাগাদ ফিরে এলাম শ্রীনগরে। এখনো ডাল লেক যাওয়া হয়নি তাই এবারের গন্তব্য এবার ডাল লেক। পুরো শ্রীনগর জুড়ে স্বচ্ছ পানির প্রায় ৩২ কি.মি দীর্ঘ এ লেক। মাছের চলাচলাসহ লেকের তলানিতে শেওলাও স্পষ্ট দেখা যায়। দরাদরি করে দুটি শিকারায় উঠে পড়লাম, পর্যটন এলাকা বলে দরাদরি ঠিক মতো না করতে পারলে পয়সা অনেক চলে যাবে। সূর্য হেলে পড়লেও তখনো বেশ কড়া রোদের ঝলসানি কিন্তু আবহাওয়া আরামদায়ক। শিকারায় উঠতেই ভাসমান ছোট ছোট দোকানগুলো এসে হাজির, ক্রেতাদেরকে ফুসলানোর জন্য বেশ চেষ্টা করলেও তেমন লাভ হলোনা। শসা নিলাম, বড় পাতায় পরিবেশনটা বেশ চমৎকার। ডাল লেকের মিঠা পানির মাছ দেখে জাতিকে আর দমিয়ে রাখা গেলো না। বয়স্ক কাশ্মীরি চাচা বেশ চমৎকার করে ফিস ফ্রাই করে দিলেন যার স্বাদ অমৃত।

 

ডাল লেক শ্রীনগরের প্রাণ। লেককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ফ্লোটিং মার্কেট, পোষ্ট অফিস, হাউজবোট, মসজিদ, দোকান, সবজি বাগান, রিসোর্ট সবকিছু। সকল কিছুই ভাসমান। ডাল লেকের সবচেয়ে উপভোগ্য হলো হাউজবোটে রাত্রি যাপন সময়ের স্বল্পতা আর হোটেল বুকিং থাকায় হাউজবোটে থাকার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারিনি। আবার কাশ্মীর যাওয়ার সুযোগ হলে হাউজবোটে থাকা প্রধান্য পাবে নিঃসন্দেহে। ২০০০/৭০০০ রুপীর হাউজবোট বড় বড় তারকা হোটেলের সকল সুযোগ সুবিধা দিয়ে থাকে। মনোরম আবহাওয়ায় শিকারায় ঘুরে বেড়ালাম ডাল লেকের অলিতে গলিতে। মীনা বাজার, লেকের ধারে সাড়ি সাড়ি দোকান। দোকানের বাহিরের পরিবেশ বুঝার উপায় নেই কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করতেই অবাক। বিশাল বিশাল একেকটি দোকান। লক্ষ লক্ষ টাকার মালামাল নিয়ে বসে আছেন লেকের পাড়ে। এসব দোকানের মালিকদের অভিজাত্য বিমোহিত হওয়ার দাবী রাখে। বাংলাদেশকে তারা অনেক বেশী জানেন। 


বাংলাদেশী প্রচুর মানুষ এখানে আসে। দোকান মালিকের সাথে দীর্ঘক্ষন গল্প করলাম দোকানের সামনে বসে। পাটাতন বরাবর ডাল লেকের স্বচ্ছ পানি। শিকারাগুলো বয়ে যাচ্ছে দোকানের সামনে দিয়ে, স্বর্গীয় মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। কাশ্মীরী শাল, কাবলী বা খান ড্রেস না কিনলে কাশ্মীর ভ্রমন অপূর্ণ থেকে যাবে। বিদেশী পর্যটক ছাড়াও অসংখ্য পর্যটকে মুখরিত ডাল লেক। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা  ঘনিয়ে আসছে আর ডাল লেক তার সৌন্দর্য্যের পসরা সাজিয়ে বসেছে। অত্যন্ত উপভোগ্য বিকেল কেটে গেলো ক্ষনিকের মধ্যে। অনিচ্ছা সত্তে¡ও কাশ্মীরের উত্তপ্ত পরিবেশের কারণে ফিরে আসতে হলো হোটেল ক্রিষ্টালে। 

 

ফ্রেস হয়ে শহরটা একনজর দেখার জন্য হোটেল থেকে বেড়িয়ে অল্প দূর থেকেই ফিরে আসাতে হলো। জনশূন্য রাস্তাঘাট, রাত ৮ টা বাজতেই মার্কেট, দোকানপাট প্রায় সবই বন্ধ। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া রাস্তা ঘাটে লোকজনের উপস্থিতি নেই বলা চলে। শান্ত হয়ে এসেছে নগরী। হোটেলের আশেপাশে ঘুরাঘুরি করে ফিরে এলাম।

পরদিন ফেরার পালা, সকালে জুম্মুর উদ্দেশ্যে বের হতে হবে। রাতের খাবার খেয়ে ট্যুর ম্যানেজার জাবেদের দেনা পাওয়া পরিশোধ। বয়সে আমাদের সমবয়সী যুবক হলোও খাঁটি ব্যবসায়ী মানুষ। মোট বিল থেকে মাত্র ২০০ রুপীও কম দেয়া গেলো না। হিসাব চুকিয়ে যখন রুমে ফিরলাম ততক্ষনে সবাই গভীর ঘুমের রাজ্যে ডুব দিয়েছে ইতিমধ্যেই।



এবার ফেরার পালা। হাতে সময় কম আর কয়েকদিন যাবত ক্যাবল কার দুর্ঘটনার কারণে বন্ধ রয়েছে গুলমার্গ যাওয়া হয়নি। মাত্র দুইদিন কাশ্মীর ঘুরে অতৃপ্তি নিয়েই দেশের পথ ধরতে হচ্ছে। কাশ্মীরের স্বাদ উপভোগ করতে আরো কয়েকদিন থাকা জরুরী ছিলো। ভূ-স্বর্গে বসবাসের তৃপ্তি আর মন ভরে ঘুরাঘুরি কোনটাই হয়নি। শুধু একনজর চোখ বুলিয়ে যাওয়া হয়েছে। হাতে আরো ২/৩ দিন সময় থাকলে মনটা তৃপ্ত হতো। ঠিক যেভাবে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কাশ্মীর এসেছিলাম ঠিক সেভাবেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দেশে ঢুকতে হবে। আরেক সমস্যা হলো, ফাইজুর ভাইর ভিসার মেয়াদ ৭ জুলাই পর্যন্ত। অন্তত তার ভিসার শেষ দিন যেনো বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারি এজন্য কোন রিস্ক নিলাম না।


জুম্ম থেকে দিল্লী ট্রেনের টিকেট পাওয়া যায়নি, জুম্মু পৌছতে প্রায় ১০ ঘন্টা লাগবে জুম্মু গিয়ে ব্যবস্থা করতে হবে তাই হাতে সময় নিয়ে সকাল সকাল প্রস্তুত হয়ে নিলাম সবাই। জাবেদের পরিবর্তে এবার চালকে আসনে আরিফ, যথেষ্ট ভদ্র ও অমায়িক। আমাদের নিয়ে রওয়ানা হয়ে গেলো জুম্মুর উদ্দেশ্যে, রাস্তা তুলনামূলক ফাঁকা। দুই পাশের  সবুজ পাহাড়ী প্রকৃতির সৌন্দর্য্যে বিমোহিত। পাহাড়ের গায়ে উঁচু রাস্তা, নিচে বয়ে চলা পাহাড়ী নদীর পানির শব্দ মনে মাদকতা তৈরী করে। গাড়ীতে নিরবতা বিরাজ করছে, সবাই ঘুমে ঢলে পড়েছে। চালক এক ধ্যানে ড্রাইভ করছেন আর আমি প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে ফেললাম নিজেকে। পাহাড় থেকে জনপদে, আবার ডাল লেকে, কখনো ঝিলেমে, বরফের রাজ্যে, ফুলের রাজ্যে, কাশ্মীরি নির্যাতিত মানুষের মাঝে, শান্তিপ্রিয় জনতার মাঝে।


জুম্মু পৌছতে আমাদের দুপুর ২ টা বেজে গেলো। কাশ্মীরের শীতল পরিবেশ এখানে নেই। প্রচন্ড গরম জুম্মু জুড়ে। সাময়িক বিশ্রামের জায়গা করে নিলাম একটি হোটেলে। এরকম অনেক হোটেল আছে যেগুলিতে কয়েক ঘন্টার জন্য রুম ভাড়া পাওয়া যায়। চালক আরিফ হোটেলটি ঠিক করে দিলো। যেহেতু ট্রেনের টিকেট পাওয়া যায়নি তাই দিল্লী গামী ¯িøপিং বাসই ভরসা। বাস ছাড়বে রাত ৯.৩০ বাজে, তখনো ৬ ঘন্টা বাকী। প্রচন্ড দাপদহে কোথাও ঘুরতে বের হওয়ার চেয়ে হোটেলের এসিতে ঘুমটাই বেশী আরাম দায়ক মনে হলো। এক রুমের এ মাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত বিশাল এক বেড। এক বেডেই সবার স্থান হলো কিন্তু শান্তির ঘুমে ব্যাঘাত ঘটালো ছারপোকা। সন্ধ্যায় আবহাওয়ার আর্দ্রতা কিছুটা কমলে প্রস্তুতি নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম বাস স্ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে। ৮.৩০ নাগাদ বাসষ্ট্যান্ডে হাজির। ডিম রুটি দিয়ে রাতের খাবার সেড়ে নিলাম।


গাড়ীতে উঠে পড়লাম বিপত্তিতে, একই সিট কাটা হয়েছে তিন জনের নামে। অচেনা অজানা বিদেশ বিভুঁইতে এ অবস্থায় পড়লে টেনশনে একটু পড়তেই হয়। কন্টাক্ট্রার অবশেষে আমাদের সুব্যবস্থা করে দিলেন। গাড়ীতে উঠে অবাক, এটাতো গাড়ী না গাড়ীর ভিতরে কেবিন। বরিশালের লঞ্চের মতো দুই জনের ঘুমানোর ব্যবস্থা একটা কেবিনে। রাতে গাড়ীতে লম্বা পথের ধকল অনুভূত হচ্ছেনা। যাত্রার কিছু পরপর শুরু হলো প্রচন্ড বৃষ্টি। ভেতওে এসির ঠান্ডা আর বাহিরে বৃষ্টি¯œাত পরিবেশ মনকে প্রশান্ত করে দিলো।

সারাদিনের ক্লান্তি শরীরের উপরে ভর করতেই ঘুমের জগতে হারিয়ে গেলাম। যখন ঘুম ভাঙ্গলো চলন্ত দৈত্যটা দ্রæত গতিতে ছুটে চলছে আমাদের নিয়ে। ভোর হতে হতেই দিল্লীর কাছাকাছি পৌছে গেলাম। আস্তে আস্তে প্রবেশ করছি দিল্লীতে আর শহর দেখছি গাড়ীর গøাস ভেদ করে। দিল্লীর রাজপথ তখনো সচল হয়নি। সকাল বেলার ইন্ডিয়ার গল্প আগেও শুনেছি কিন্তু এবার সচোখে দেখেছি। প্রাকৃতিক কর্ম সাড়তে নারী, পুরুষ, কিশোর, বয়স্করা হাজির। কেউ কর্ম সেড়েছেন কেউ আবার মটর সাইকেল আর পানির বোতল সাথে করে হাজির হয়েছেন। গল্পকে নিজের চোখে দেখে অবাক আর লজ্জিত দুইটাই হলাম। আতিক ভাইর বাঁধায় এ ঐতিহাসিক দৃশ্য ধারণ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হলাম।


সকাল ৭.০০ টায় গাড়ী থেকে নেমে পড়লাম দিল্লীর রাজপথে। সিএনজি ঠিক করে রওয়ানা দিলাম পুরাতন দিল্লীর জামে নগরের উদ্দেশ্যে। দিল্লী আসলাম কিন্তু আগ্রা যেতে পারছি মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল। ইচ্ছা থাকলেও সময় স্বল্পতা সে সুযোগটা কেড়ে নিলো। জামে নগরের আইএসও র গেষ্ট রুমে আমাদের আশ্রয় হলো। ফ্রেস হয়ে সকালের নাস্তা সেড়ে আইএসও বিশাল এষ্টেট ঘুরে দেখে নিলাম আর দিল্লীর স্থানীয় মুসলমানদের সাথে মন খুলে গল্প করলাম। বাংলাদেশ আর ইন্ডিয়ার সম্পর্ক, রাজনীতি, কূটনীতি নানা বিষয়ে কথা বার্তা চললো সে আসরে। বিকাল ৪.৩০ কলকাতাগামী রাজধানী এক্সপ্রেস ধরতে হবে তাই দুপুরের লাঞ্চ সেড়ে রওয়ানা হলাম নয়া দিল্লী রেল ষ্টেশনের উদ্দেশ্যে।


স্টেশনে পৌছে জানলাম ট্রেন ১.৩০ মিনিট লেটে আসবে। ট্রেন আসতেই ১৭/১৮ ঘন্টার প্রস্তুতি নিয়ে যাত্রা করলাম। ট্রেনে পরিবেশিত ধারাবাহিক খাবার শেষ করা, বিরতি দিয়ে ঘুম, জমানো হাজারো গল্পে গল্পে পরদিন দুপুর নাগাদ পৌছে গেলাম কলকাতার শিয়ালদহ ষ্টেশনে। কলকাতা শহর এখন কিছুটা পরিচিত হয়েছে। লোকাল ট্রেন আর বাসে গাদাগাদি করে মফিকুল ভাইর বাসার উদ্দেশ্যে ছুটছি। গন্তব্যে পৌছতে পৌছতেই প্রচন্ড বৃষ্টি কলকাতাকে ভিজিয়ে দিয়েছে।  


লাঞ্চ সেরে বেরিয়ে পড়লাম শপিং এর উদ্দেশ্যে। মুজাহিদ ভাই আর নোমানকে এতোক্ষন কলকাতায় শপিং হবে বলে দমিয়ে রাখলেও এবার আর দমিয়ে রাখা গেলো না। বৃষ্টি কমতেই স্থানীয় এক বাঙ্গালী আঙ্কেলকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। নিউমার্কেট যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও দূরত্ব আর বৃষ্টির কারণে সম্ভব নয় বলে পাশেই বিগ বাজার আর এম. বাজারের ঘুরে ফিরে শপিং করে কাটিয়ে দিলাম সন্ধ্যা অবধি। পোষক, খাবার সহ প্রয়োজনীয় সকল কিছুই মানসম্মত মূল্যে পাওয়া গেলো সুপার শপ দুটিতে।


চলবে...





রিলেটেড নিউজ:


গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:




 শীর্ষ খবর

কমলনগর সরকারি উপকুল ডিগ্রী কলেজের সবুজ বাংলাদেশের কমিটি গঠন -বিডি টাইমস

জবিতে ‘মুক্তমঞ্চ’ নির্মানের প্রস্তাবণা

‘সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত হোক লেখনীর ধারায়’

আবরার হত্যার প্রতিবাদে উত্তাল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

জবির মানবিক বিভাগের ভর্তিপরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ

তাইওয়ানের হাত থেকে কিরিবাতি কেড়ে নিলো চীন

ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে রেড ডেভিলরা, বাংলাদেশ ১৮৭

দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা

ভিসির পদত্যাগ দাবিতে বশেমুরবিপ্রবিতে শিক্ষার্থীদের আমরণ অনশন

লালপুরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পিকআপ খাদে, চালক নিহত

লালপুরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পিকআপ খাদে, চালক নিহত

খালেদ মাহমুদকে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার

শিল্পকর্মে বঙ্গবন্ধু

মোদির সেই রমরমা আর নেই

প্রশাসন ‘ম্যানেজ করে’ ক্যাসিনো চালাতেন খালেদ




বার্তা প্রধান: রেহমান কামাল
৩০১,ড.নবাব আলী টাওয়ার (৩য় তলা)
পুরানা পল্টন,ঢাকা-১০০০ ,বাংলাদেশ ।


ফোন :  02-7176978  মোবা:  01732-706938
Email :  editor.bdtimes@gmail.com


All Rights Reserved © bd-times.com

This site is developed by -khalid (emdad01557html5css3@gmail.com).

ভূ-স্বর্গ কাশ্মীর, ঐতিহ্যের দিল্লী এবং দাদাবাবুদের কলকাতার পথে পথে (পর্ব:৬)